১০৮। সূরা আল কাওসার (প্রাচুর্য)

পটভূমিঃ মুহাম্মাদ (স) এর শিশুপুত্র মারা যাবার পর কাফেররা তাঁর ঐ কষ্টকর সময়ে আনন্দ করেছিল এবং বলাবলি করছিল, মুহাম্মাদ (স) এবার শেকড়কাটা/নির্বংশ হয়ে গেল। মানুষ সাধারনত পুত্রের মাধ্যমে বংশধারার সম্মান, ঐতিহ্য চলমান থাকে। মুহাম্মাদ (স) এর ছেলেসন্তান মারা যাবার পর তারা বলে বেড়াচ্ছিল যে, মুহাম্মাদ (স) এর নাম, বংশ, পারিবারিক ঐতিহ্য আর টিকে থাকবে না তাঁর মৃত্যুর পর। এই পরিস্থিতিতে আল্লাহ এই সূরা নাযিল করলেন।     

হতাশ মুহুর্তে ছোট্ট এই সূরা নাযিল করা হলেও বিশাল দান এর সুনিশ্চিত সংবাদ এসেছে এখানে। অপমান আত্ম মর্যাদা, সম্মান কে হুমকির মুখে ফেলে দেয়, যার বিপরীতে সবচাইতে বড় ওষুধ হলো ঐশ্বরিক আশ্বাস যা আত্মিক শক্তি শুধু ফিরিয়ে দেয় না বরং প্রশান্তি সহকারে দৃঢ় করে।   

এর মাধ্যমে আল্লাহ তার প্রিয় নবীর গভীর মানসিক নিরাময় বা deep emotional healing সাধন করেছেন। 

মূল থীমঃ মানুষের দেয়া অস্থায়ী, অল্প অপমান এর বিপরীতে আল্লাহর দেয়া সম্মান অগনিত ও চিরস্থায়ী। মানুষের জীবনের ৩ গুরুত্বপূর্ন চাহিদা ও উপাদান এখানে এড্রেস করা হয়েছে। ১। সম্মান (কাওসার), ২। অর্থপূর্ন কাজ (নামাজ, কুরবানী) ৩। স্থায়ী উত্তরাধিকার (রাসূল (স) কে আবতার না বলা)

সূরার সারসংক্ষেপঃ ১ম আয়াতে বর্নিত হয়েছে যে আল্লাহ মুহাম্মাদ (সঃ) কে কাউসার দান করেছেন। পুত্র সন্তান মারা যাওয়ায় তিনি যে দুঃখ পেয়েছিলেন সেজন্য সান্তনা স্বরূপ আল্লাহ তাকে অশেষ দান করার বিষয়টি উল্লেখ করে মহাপুরস্কার দানের মাধ্যমে তাকে খুশি করে দিলেন।     

কাওসার শব্দের অর্থ প্রাচুর্য/ অনেক অনেক ভালো। এটি যেমন দুনিয়াতে তার প্রতি প্রদত্ত অসংখ্য নিয়ামত বোঝায় তেমনি আখিরাতেও বিশেষভাবে হাউজে কাউসার বুঝায়, যা আল্লাহ তাকে জান্নাতে দান করবেন। ক্রিয়া হিসাবে 'আ’ত্বইনা' অর্থাৎ 'আমি তোমাকে দিয়েছি' ব্যবহার করেছেন আল্লাহ। আল্লাহ নিজেকে এই দানের সাথে সম্পৃক্ত করে বোঝাতে চাইছেন মুহাম্মাদ (স) তাঁর কাছে কত প্রিয়। তিনি সন্তান হারিয়েছেন তো কি হয়েছে? আল্লাহ তাঁর সাথে আছেন এবং তিনি তাকে দিয়েছেন। এই কথায়, আল্লাহর সাথে তাঁর এই ভালবাসার সম্পর্ক যেন কাফেরদের ঐ বিদ্রুপের প্রতি চপেটাঘাত, মনের আগুনে আরো ঘি ঢেলে দেওয়া।      

এখানে আল্লাহর শব্দ চয়ন খুবই পারফেক্ট। আসুন দেখে নেই কিছু বিষয়।      

দান করা শব্দটি আরবীতে কয়েকটি ভাবে ব্যবহার করা যায়। পুরষ্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারনত ‘ওয়াহাবা’ ব্যবহৃত হয়। যা দেওয়ার সাথে সাথে দায়িত্বও দেওয়া হয় এবং যা দিয়ে আবার নেয়ার সম্ভাবনা থাকে; তাকে বলে ‘আতা’। আল্লাহ এই শব্দগুলো ব্যবহার না করে আ’ত্ব শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আ’ত্ব ব্যবহার করা হয় তখনই যখন দাতা গ্রহীতার উপর খুশি হয়ে দান করে, যা গ্রহীতার নিকট অপ্রত্যাশিত থাকে; যে দান খুব বড়, অতুলনীয় এবং তা ফিরিয়ে নেয়ার কোন সম্ভাবনা থাকে না। সুন্দরতম মানুষের মুহাম্মাদ (স) এর জন্য কি সুন্দরতম ও পারফেক্ট শব্দের ব্যবহার আল্লাহর! আল্লাহু আকবার!!!

'আ’ত্বইনা' অর্থাৎ 'আমি তোমাকে দিয়েছি' কথাটিতে অতীত কালের ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে। অনেক দান/ নিয়ামত তিনি (মুহাম্মাদ) এই দুনিয়াতেই পেয়ে গেছেন আবার ভবিষ্যতের কোন দান অতি অবশ্যই হবে বোঝাতেও অতীতকাল ব্যবহৃত হয়; সেদিক বিবেচনা করেও কথাটি পারফেক্ট।     

কাউসার শব্দটিও একটি প্রাচুর্যসূচক বিশেষন। কাসরহ এর চেয়ে কাসীর বেশি আবার কাসীর এর চেয়ে কাউসার বেশি। অর্থাৎ সর্বোচ্চ হলো কাউসার। আল্লাহ নবী মুহাম্মাদ (স) কে সর্বোচ্চ দান করেছেন এবং করতে থাকবেন ও করবেন।     

আল্লাহ মুহাম্মাদ (সঃ) কে যে অগনিত নিয়ামত দান করেছেন, মর্যাদা দিয়েছেন তা আসলে লিখে শেষ করা যাবে না। এই দান দুনিয়া ও আখিরাতে। কিছু নমুনাঃ ঈমান এর জন্য কালেমাতে মুহাম্মাদ (সঃ) এর নাম পাঠ করতে হয়। প্রতিবার আযানে মুহাম্মাদ (সঃ) এর নাম উচ্চারিত হচ্ছে। দুনিয়ায় প্রায় সব সময়েই আযান উচ্চারিত হচ্ছে; কোথাও ফযরের, কোথাও আসরের বা মাগরিব অথবা ঈশারঃ এভাবে প্রায় সব সময়ই তাঁর নাম ও মর্যাদার কথা উচ্চারিত হচ্ছে। নামাজ শুরুর আগে ইকামতে ও নামাযের মধ্যে মুহাম্মাদ (সঃ) এর নাম উচ্চারিত হচ্ছে তাশাহুদ এ। সকল মুমিনের অন্তরে রয়েছে তাঁর প্রতি নিখাদ ভালোবাসা ও মস্তিস্কে রয়েছে তাঁর মহত্ব, বড়ত্ব ভালোবাসার চিন্তা।   

পূর্ববর্তি কিতাব সমূহেও মুহাম্মাদ (সঃ) এর নাম ও বর্ননা উল্লেখ ছিলো। পূর্ববর্তি নবীরাও মুহাম্মাদ (সঃ) এর শ্রেষ্ঠ্যত্ব স্বীকার করেছেন। মুহাম্মাদ (সঃ) এর ম্যাসেজ ও নাম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে গেছে।  মুহাম্মাদ (সঃ) এর রেখে যাওয়া আল কুরআন আজও অবিকৃত অবস্থায় আছে। আখিরাতেও মুহাম্মাদ (সঃ) সর্বোচ্চ মর্যাদা পাবেন। স্বয়ং আল্লাহ ও ফেরেশতারা মুহাম্মাদ (সঃ) এর দরুদ পাঠ করেন। আল্লাহ মুমিনদেরকেও মুহাম্মাদ (সঃ) এর দরুদ পাঠ করার জন্য বলেছেন এবং তা না পাঠকারীদের জন্য ধ্বংসের কথা বলেছেন। মুহাম্মাদ (সঃ) কে অনুসরন করার ম্যাধ্যমে আল্লাহকে অনুসরন করা হয়। অন্য নবীদের নাম ধরে ডাকলেও আল কুরআনে আল্লাহ নবী মুহাম্মাদ (সঃ) কে নাম ধরে ডাকেননি। তিনি ভালোবাসাপূর্ন সম্বোধন ব্যবহার করেছেন। আল্লাহ নবী মুহাম্মাদ (সঃ) কে আল কাউসার (আখিরাতের হাউজে কাউসার) দান করেছেন।  
আল্লাহ তা’আলা অনেক নবীকেই মোজেজা (বিস্ময়কর নিদর্শন) দান করেছেন। ঐসব নবীরা যখন বেঁচে ছিলেন তখন তাদের আশেপাশের মানুষেরা সেই মোজেজা দেখেছে এবং তা দেখে অবাক হয়ে তা মোজেজা হিসাবে মেনে নিয়েছে। কিন্তু নবীরা মারা যাবার পর নবীদের সাথে সাথে মোজেজাও চলে গেছে তাই তখন মানুষেরা তা কাহিনী বা গল্প হিসাবে মেনে নিয়েছে।   
অন্যান্য নবীদের মোজেজা আশেপাশের মানুষেরা দেখেছে কিন্তু তারা যখন তা বলেছে এবং অন্যরা শুনেছে তখন শ্রোতাদের নিকট তা আর মোজেজা থাকেনি। এর কারন তা মানুষ কেউ চাইলে বিশ্বাস করেছে কেউ চাইলে বিশ্বাস করেনি। অর্থাৎ আগের নবীদের মোজেজা ছিলো চোখে দেখার মোজেজা। কিন্তু মুহাম্মাদ (সঃ) এর মোজেজা হলো জীবন্ত মোজেজা; যা আজীবন অপরিবর্তিত থাকবে। এই মোজেজা আল কুরআন যেমন চোখের সামনেই দেখার মোজেজা হিসাবে আছে তেমনি এটি শোনার মোজেজাও বটে কারন মানুষ শোনার পর তা নিজেই দেখে মিলিয়ে নিতে পারছে।   
অনেক নবীকেই আল্লাহ নৈতিক বিজয় দান করলেও রাজনৈতিক বিজয় দেননি। যেমন নূহ (আঃ) কে ৯৫০ বছর চেষ্টার পরও আল্লাহ তাকে রাজনৈতিক বিজয় দেন নাই। আল্লাহ মুহাম্মাদ (সঃ) কে নৈতিক বিজয় দান করার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিজয় দান করেছেন। ৪০ বছর বয়সে নবুয়্যাত পাওয়ার পর বাকি ২৩ বছরেই আল্লাহ তাআলা তাঁকে বৈপ্লবিক বিজয় দান করেছেন।    
ইতিহাসের সব বিপ্লবের দার্শনিক, পাঠক ও বাস্তবায়নকারী আলাদা। তবে ব্যতিক্রম  মুহাম্মাদ (স)। তিনি তত্ত্ব দিয়েছেন, শুধু বক্তৃতা দেন নাই বরং নিজেই  বাস্তবায়ন করেছেন। ইতিহাসের বাকি সব বিপ্লব রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক হলেও  ইসলামী বিপ্লব মাত্র ২৩ বছরে মানুষের আচার-আচরন, পোশাক, লেনদেন,  কথা-বার্তা, সংস্কৃতিসহ সব বিষয়ে আমূল বিপ্লব এনেছে। আল্লাহ মুহাম্মাদ (স)  কে এমন বই/তত্ত্ব ও বিজয় (সার্বজনীন কল্যান সমাজ) দিয়েছেন যা আর কাউকে দেন নাই।    
আল্লাহ তার অনুগ্রহ ও উপহার দেওয়ার কথা বলার পর ২য় আয়াতে তার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ, প্রতিদান হিসাবে নামাজ পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ নামাজ হলো শুকরিয়া আদায় ও প্রতিদানের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম। এই নামাজ পড়তে হবে শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য, লোক দেখানোর জন্য নয়। এর সাথে সাথে কুরবানী (ও দান) করার কথাও তিনি বলেছেন। কাবার দিকে নামাজ ও কুরবানী ২ টিই মুসলিম জাতির পিতা ইবরহীম (আ) কে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং তাঁর ও ইসলামী ঐতিহ্যকে সমুন্নত করে।  

এখানে নামাজের পর যাকাত এর কথা না বলে কুরবানীর কথা কেন বলা হলো? অনেক আলেমরা ব্যাখ্যা দিয়েছেন মুহাম্মাদ (স) এর যাকাত দেয়ার মত সম্পদ ছিল না এজন্য যাকাতের কথা আসেনি। আবার কেউ ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, নামাজের পর কুরবানী বলে এখানে ঈদুল আযহার কথা উল্লেখ করা হয়েছে যখন ঈদের নামাজ পড়ার পর পশু কুরবানী করতে হয়।   

এখানে ‘রব্বিকা’ বলা হয়েছে অর্থাৎ তোমার রব। মানুষ জামায়াতে নামাজ পড়লে একসাথে অনেকে থাকে। তাহলে সেখানে রব্বিকুম বা তোমাদের রব বলা যেত। আল্লাহ এখানে রব্বিকা হয়তো বলেছেন এই জন্য যে, সবাই আলাদা আলাদাভাবে রবের সাথে সালাহ এর মাধ্যমে একান্তভাবে যুক্ত হতে পারে। এই সুযোগ আল্লাহ দিয়েছেন। প্রত্যেকের সাথে রবের সম্পর্ক একান্ত ব্যক্তিগত ও স্বতন্ত্র।      

আল্লাহ নামাজ পড়তে বলেছেন এবং নামাজ পড়ার মূল কেন্দ্র হলো কাবা। এখানে আল্লাহ একটি  প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন যে, শীঘ্রই নবী মুহাম্মাদ (স) কাবার নিয়ন্ত্রণ নিতে চলেছেন।

এভাবে আল্লাহ দানের কৃতজ্ঞতার রেসিপি হিসাবে দুই ধরনের কর্মকান্ড শিখিয়েছেনঃ নামাজের মাধ্যমে আত্মিক যোগাযোগ এবং কুরবানীর মাধ্যমে বাস্তব ভাল কাজ।     

৩য় ও শেষ আয়াতে আল্লাহ নবী মুহাম্মাদ (সঃ) এর শত্রুদের কথা বলেছেন।     

এখানে ব্যবহৃত ‘শানি’ অর্থ সেই শত্রু যে কিনা প্রতিপক্ষের কষ্টকর পরিস্থিতিতে আনন্দবোধ করে, ঘৃণা প্রকাশ করে তবে অন্তরে ঘৃণার পরিমান আরো তীব্র থাকে যা সে প্রকাশ করেনা।     

মুহাম্মাদ (সঃ) এর ছেলেরা মারা যাওয়ার পর তারা তাঁর ঐ কঠিন, কষ্টকর ও দূর্বলতম সময়ে তাঁকে আবতার (শিকড়কাটা) বলেছিল। কিন্তু মূলত তা্রাই সব ধরনের ভালো থেকে বঞ্চিত; এই দুনিয়ায় ও আখিরাতেও। তারা তখন হারিয়েছিল তাদের মান, মর্যাদা, আধিপত্য, গর্ব সব কিছু। একটি গাছের যখন শিকড় কেটে যায় তখন তা মূল বস্তু থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কিছু পাবার জন্য যে সংযোগ লাগে তা থেকে আলাদা হয়ে যায়। কাফিররা মূলত ইসলাম তথা সর্ব প্রকার কল্যান থেকেই আলাদা, বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তাদের কথা এখন কেউ পজিটিভলি স্মরণ করে না, বরং ঘৃনাভরে স্মরণ করে। এজন্য আল্লাহ এভাবে বলেছেনঃ নিশ্চয়ই তোমার শত্রুরাই তারা যারা শিকড়কাটা। তাদের নিয়ে তোমার চিন্তা করার দরকার নাই। তুমি বরং আমার দিকে চিন্তাকে কেন্দ্রীভূত করুন। আগের আয়াতের বর্ননা অনুযায়ী নামাজ পড়ুন, কুরবানী করুন।     

এখানে লক্ষনীয় যে, তারা মুহাম্মাদ (স) কে শেকড়কাটা বলছিল, এর জবাব আল্লাহ দিয়েছেন একদম শেষে, বলতে গেলে শেষ শব্দে। আল্লাহ তাদেরকে দূরে নিক্ষেপ করেছেন সূরার একদম শেষে স্থান দিয়ে। এই বাচন ভংগীটা এমন যে, আবতার (শেকড়কাটা) তো কেউ না কেউ হবেই। তবে সেটা মুহাম্মাদ (স) নয়, বরং তার প্রতি এক কথা যারা বলে তারাই।  এই ‘আবতার’ শব্দটি একটি বিশেষ্য। শব্দের বিশেষ্য রুপ সাধারনত ধ্রুব হিসাবে ব্যবহৃত হয় অন্যদিকে ক্রিয়ারুপ পরিবর্তনশীল কিছু বর্ননা করতে ব্যবহৃত হয়। এখানে আবতারকে আল্লাহ বিশেষ্য রুপ এ ব্যবহার করে এটা বুঝিয়েছেন যে, যুগে যুগে যারাই নবী মুহাম্মাদকে, ইসলামকে কটাক্ষ করবে, তাদের পরিনতি হবে আবতার।     

আরেকটি বিষয় লক্ষনীয়। রাসূল (স) তাঁর সন্তান হারিয়েছিলেন কিন্তু আল্লাহ তাকে অশেষ পুরস্কার দান করেছেন। তিনি পুত্র ইবরাহিমসহ অন্য পুত্রদের হারিয়েছেন তাঁর বদলে আল্লাহ তাকে দিয়েছেন ইবরাহিম (আ) এর ধর্ম, উত্তরাধিকার, দিয়েছেন সন্তানরুপী অসংখ্য উম্মাত।      

এভাবে আল্লাহ শুরুতেই মুহাম্মাদ (স) কে দান করার সুসংবাদ দিয়ে বক্তব্য শুরু করেছেন এবং শেষে শত্রুর জবাব দিয়েছেন। আল্লাহর দেয়া কাওসার যার সম্মান অগনিত, চিরস্থায়ী এর বিপরীতে মানুষের দেয়া আবতার এর  অপমান সামান্য, সাময়িক। সুতরাং, মানুষের কথায় নয় আল্লাহর দানে মূল্য মাপতে হবে। 

সূরা আল কাউসার এ মোট শব্দ ১০টি اِنَّاۤ اَعْطَیْنٰكَ الْكَوْثَرَ- فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ- اِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْاَبْتَرُ  

প্রত্যেক আয়াতে একবার করে ব্যবহৃত হরফ বা বর্ন ১০টি  

সমগ্র সূরায় একবার করে ব্যবহৃত হরফ বা বর্নও সেই ১০টি ذ، ث، ح، ش، ص، ط، ع، ف، ه، ي

মাঝের আয়াতে কুরবানির কথা বলা হয়েছে সেটা জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখে করা হয়।

আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ আগের (১০৭ তম) সূরা আল মাঊন এর ২,৩ আয়াতে আল্লাহ লোকদের কৃপনতা এর কথা বলেছেন অন্যদিকে এই সূরা আল কাউসার এর ১ম আয়াতে আল্লাহর প্রাচুর্যপূর্ন দান এর কথা বলেছেন। মাঊন এর ৪, ৫ নং আয়াতে নামাযে উদাসীনতার কথা বর্নিত এবং কাউসারের ২য় আয়াতে আল্লাহ নামাজের নির্দেশ দিয়েছেন। মাঊনের ৬ষ্ঠ আয়াতে লোক দেখানোর কথার বিপরীতে কাউসারের ২য় আয়াতে শুধুমাত্র রবের জন্যই করার কথা এসেছে। মাঊনের ৭ম আয়াতে মামুলি জিনিস দেয়া থেকে বিরত থাকার বিপরীতে কাউসারের ৩য় আয়াতে কুরবানী করার মত মর্যাদাপূর্ন বড় দানের কথা বলা হয়েছে। সবশেষে কাউসারে বর্নিত দুশমনরা যে শিকড় কাটা তার মিল রয়েছে মাঊনের ১ম আয়াতের সাথে। তারা দুনিয়াতে তো বটেই, আখিরাতেও বিফল হবে। কি অসাধারন মিল এই পর পর ২ টি সূরায়!  

পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ তৎকালীন কুরইশ, মুশরিকরা মুহামাদকে ‘আবতার’ (শিকড়কাটা) বলেছিল। কিন্তু আল্লাহ তাকে জানিয়ে দেন যে, তিনি আসলে আবতার নন, বরং তার শত্রুরাই আবতার। অর্থাৎ আল্লাহ এখানে তাদের কথার ডিফেন্ড করেছেন ডিফেন্সিভ মুড এ। তারা যা বলেছে তা ঠেকিয়ে দিয়ে আবার তাদের দিকে কাউন্টার দিয়েছেন।     

পরের (১০৯ তম) সূরা আল কাফিরুন এ আল্লাহ তাঁর নবীর পক্ষ থেকে তাদের কথার জবাব দেন এবং কাউন্টার এটাক এ যান। সূরা আল কাউসার এর ডিফেন্সিভ মুড এবার কাউন্টার এট্যাকের অফেনসিভ মুড এ কনভার্ট হয়। তাদেরকে আল্লাহ সরাসরি ‘কাফির’ হিসাবে সম্বোধন করতে বলেন। সুতরাং, কাফিররা মুহাম্মাদ (স) কে ‘আবতার’ বলেছিল। সূরা আল কাউসার এ মুহাম্মাদ (স) আল্লাহর সাহায্যে সেই অ্যাটাক হতে আত্মরক্ষা করে তাদেরই এটাক তাদের দিকে ফিরিয়ে দিলেন আয়াত ৩ এর মাধ্যমে। এরপর সূরা আল কাফিরুন এর ১ম আয়াতের মাধ্যমে তিনি আল্লাহর নির্দেশে অ্যাটাক করলেন তাদেরকে ‘কাফির’ বলে।

এছাড়া মুহাম্মাদ (স) এর শত্রুর কথা সূরা কাউসারে বলার পর সূরা আল কাফিরুন এ তাদের পরিচয় সরাসরি দিয়ে দেন আল্লাহ। এই শিকড়কাটাদের সাথে নবী মুহাম্মাদ (স) তাঁর সকল সম্পর্ক ও কেটে ফেলেন পরের সূরা আল কাফিরুন এ।    

উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)